সংবিধান রচনায় গণপরিষদের কাজ ও ভূমিকা | Functions and role of the Constituent Assembly

সংবিধান রচনায় গণপরিষদের কাজ ও ভূমিকা Functions and role of the Constituent Assembly in the framing of the Constitution



গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৪৬ সালের ৯ই ডিসেম্বর নতুন দিল্লির কনস্টিটিউশন বলে। গণপরিষদের ৩৮৯ জন সদস্যদের মধ্যে ২০৭ জন সদস্য এই অধিবেশনে যোগ দেন। মুসলিম লিগের প্রতিনিধি এই অধিবেশন বয়কট করেন।

গণপরিষদের প্রবীণ সদস্য সচ্চিদানন্দ সিংহকে অস্থায়ী সভাপতি নিয়োগ করা হয়। ১১ই ডিসেম্বর ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৩ই ডিসেম্বর পণ্ডিত নেহেরু ভারতীয় সংবিধানের উদ্দেশ্য বিষয়ক প্রস্তাব' (The Objective Resolutions) সমূহ উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এইসব প্রস্তাবের অধিকাংশই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন ১ই ডিসেম্বর থেকে ২৩শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে।

গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে ১৯৪৭ সালের ২১শে জানুয়ারি এবং চলে ২৬শে জানুয়ারি পর্যন্ত। এই অধিবেশনে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠিত হয়, যথা – কার্যনির্বাহক কমিটি (Steering Committee), 

কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সম্পর্কিত কমিটি, মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত পরামর্শদাতা কমিটি, সংখ্যালঘু সম্পর্কিত উপদেষ্টা কমিটি ইত্যাদি। এই অধিবেশনে হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়কে গণ পরিষদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

গণপরিষদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২২শে এপ্রিল এবং চলে ২রা মে পর্যন্ত। এতদিন পর্যন্ত গণপরিষদ এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি যা মুসলিম লিখের আপত্তির কারণ হতে পারে। যখন স্পষ্টতই জানা গেল যে, মুসলিম লিগ কোনো ক্রমেই গণপরিষদে যোগদান করবে না তখন থেকে গণপরিষদ নিজের মতো চলতে শত্রু করল। এই অধিবেশনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠন করা হয়, যথা – ইউনিয়নের সংবিধান সম্বন্ধীয় কমিটি, প্রাদেশিক সংবিধান সম্বন্ধীয় কমিটি ইত্যাদি। এই অধিবেশনে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা-সংক্রান্ত কমিটি এবং মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয় এবং উক্ত রিপোর্টের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া এই অধিবেশনের সভাপতি ড. রাজ্যের প্রসানের প্রস্তাব অনুসারে ভারতীয় সংবিধান ইংরেজি ও হিন্দি উভয় ভাষাতেই রচিত হয় শিক্ষা হয়।

১৯৪৭ সালের ১৪ই জুলাই থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত চলে গণপরিষদের চতুর্থ অধিবেশন। এই অধিবেশনে। ইউনিয়ন ও প্রাদেশিক সংবিধান সম্বন্ধীয় কমিটির রিপোর্ট দুটি পেশ করা হয় এবং রিপোর্ট দুটির ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয়। ২২শে জুলাই জাতীয় পতাকার পরিকল্পনা গৃহীত হয় এবং এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি অস্থায়ী কমিটিও গঠন করা হয়।

পরিষদের পঞ্চম অধিবেশন শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট। এই অধিবেশনের শুরুতেই মাউন্টব্যাটেনকে হীন ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। পঞ্চম অধিবেশনে সংবিধান রচনাকারী গণপরিষদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এখন থেকে গণপরিষদ সংবিধান রচনার সঙ্গে সঙ্গে আইনসভা হিসাবেও দামিত্ব পালন করবে। এই অধিবেশনে ১৯শে আগস্ট একটি খসড়া সংবিধান রচনার করা একটি খসড়া কমিটি (Drafting Committee) গঠন করা হয়। ড. বি. আর. আম্বেদক (Dr. B. I. Ambedkar)-কে এই কমিটির সভাপতি করা হয়। আম্বেদকর ছাড়া এই কমিটিতে ছিলেন গোপাল স্বামী আয়োগার, এ. কে আবার কে. এম. মুন্সী, ডি. পি. খৈতান, বি. এল. মিত্র প্রমুখ। 

খসড়া কমিটি সংবিধানের খসড়া  রচনার কাজ শুরু করে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর থেকে। ১৯৪৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভারতীয় সংবিধানের খসড়া গণপরিষদে পেশ করা হয় এবং একই সঙ্গে জনমত যাচাই করার জন্য খসড়াটিকে দেশের প্রথম শ্রেণির সাধারগুলিতে প্রকাশ করা হয়। প্রায় আট মাস যাবৎ দেশের জনগণকে এই খসড়া সংবিধান সম্পর্কে আলোচনা করার এবং সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনার সময় মোট ৭৩৯৫টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ২,৪৭৩টি সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর এবং বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধিত ও সংযোজিত হওয়ার পর ভুড়ান্তভাবে ৩৯৫টি ধারা ও ৮টি তপশিল অনুমোদিত হয়। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ২৩শে নভেম্বর সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের স্বাক্ষরক্রমে ভারতীয় সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয় এবং ১৯২০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে তা কার্যবলা হয়।

১৯৫০ সালের ২৪শে জানুয়ারি গণপরিষদের সবশেষ অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে রাজের প্রসাদকে স্বাধীন ভারতের প্রধান রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ভারতের সংবিধান রচনার কাজটি খুব সহজে রাতারাতি সম্পন্ন হয়ে যায়নি। এটি দির্ঘ সময় • দের প্রতি। এটি শুন্য করতে সময় লেগেছে মোট ২ বছর ১১ মাস ১৭ দিন, অর্থাৎ প্রায় বছর। গণপরিষদের মোট ১১টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং অধিবেশনগুলি সাকুল্যে ১৬৫ দিন ধরে চলে। প্রশক্রমে উল্লেখযোগ্য, গণপরিষদের প্রথম টিনের বাজনার কাজ হয়নি, সংবিধান রচনার পদ্ধতি নেওয়া হয়। সংবিধানের খসড়ার পর থেকেই সংবিধান রচনার কাজে সরাসরি আত্মনিয়োগ করে। গণপরিষদের মূল্যায়ন ও স্বাধীন সংবিধান বলার কাজ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ এই কাজের মধ্য দিয়েই রামাণ হয়েছিল যে, ভারতীয় জনগণই ভারতের ভবিষ্যৎ গতিকৃতি নির্ধারণের একমাত্র অধিকারী। কিন্তু ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে যে গণপরিষদ গঠিত হয় তার গঠন ও কাজের প্রকৃতি বিষয়ে নানা সীমাবদ্ধতার উল্লেখ করা হয়।

প্রথমত, গণপরিষদের কোনো গণভিত্তি ছিল না বলে অভিযোগ করা হয়, কারণ সর্বজনীন প্রাপ্তবয়ারে ভোটে নয়, সমগ্র ভারতীয় জনসাধারণের মাত্র ১০% লোকের ভোটে যে প্রাদেশিক আইনসভাগুলি গঠিত হয়েছিল, সেগুলির মধ্য থেকে গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ বাছাই করা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, তত্ত্বগতভাবে গণপরিষদ সংবিধান রচনার প্রধান কার্যক্ষেত্র হলেও প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিই ছিল এর মূল ঘা। এই প্রসঙ্গে অসিন (Austin)-এর একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ''The Assembly was the Congress and the Congress was India. "

তৃতীয়ত, সমালোচকদের মতে, "আমরা ভারতের জনগণ সংবিধান রচনা করেছে বলে যে দাবি করা হয় তা অযৌক্তিক, কারণ মূলত সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। ড. কে. B. রাস্তা করেন, "It was not we the people that made the constitution. It was the top layer of the Indian society, it was the educated middle class that made it."

চতুর্থত, রাজন্যবর্গের প্রতিনিধি ৩ সদস্যকে মনোনয়নের ভিত্তিতে গণপরিষদে স্থান দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই অগণতান্ত্রিক এবং সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে আপস করার প্রচেষ্টা বলে মনে করেন।

পঞ্চমত, গণপরিষদের নিধিত্বের দাবিকে মেনে নিয়ে তদানীন্তন কংগ্রেস নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদে পা বাড়িয়েছিলেন বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। ষষ্ঠত, কেউ কেউ আবার গণপরিষদে মুষ্টিমেয় ব্যगान (Elite domination) ও বৌদ্ধিক স্বৈরাচারের (Intellectual autocracy) প্রভাব লক্ষ করেছিলেন।

সপ্তমত, পণ্ডিত নেহেরু, ড. আম্মেলদা, এ. কে. আইয়ার প্রমুখ মুখে ভারতের নিঃস্ব, দরিদ্র জনগণের জন কালা প্রকাশ করেও শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া জমিদারদের অনুকূলে শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। গণপরিষদের এক জনৈত সদস্য (দামোদর স্বরূপ শেঠ) গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই সংবিধান পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ হলেও, ভারতের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র শ্রমজীবী, খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন, মানুষেরা স্বার্থরক্ষার কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে নেই

উপসংহার : গণপরিষদ কর্তৃক ভারতের সংবিধান সমালোচনা করা হোক কেন, সমকালীন অবস্থা ও প্রয়োজনের পরিবোক্ষিতে বিচার করলে উপরিউক্ত সমালোচনাগুলিকে সমর্থন করা যায় না। সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠন করতে গেলে অহেতুক সময় নষ্ট হত এবং বিপুল অর্থের অপচয়া হত। যেসব ব্যক্তি গণপরিষদে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, তারাই ছিলেন সমকালীন ভারতের অবিসংবাদিত নেতা। সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটের ব্যবস্থা হলে তারাই গণপরিষনে নির্বাচিত হতেন। তাছাড়া গণপরিষদে কংগ্রেস দলের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য থাকায় একদিকে যেমন সংবিধান রানার কাজে খুব একটা বিঘ্ন বা বিলম্ব ঘটেনি, অন্যদিকে তেমনি দেশের সাম্প্রদায়িক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি মাথাচাড়া দিতে পারেনি। পরিশেষে, সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পর ১৯৫২ সালের সার্বিক মারবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে যে নতুন কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠিত হয়, সেই আইনসভা যখন সংবিধানটিকে অপরিবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করে, তখন থেকেই ভারতীয় সংবিধানের মহণযোগ্যতা ও গণপরিষদের গণচরিত্র সম্পর্কে সমস্ত সন্দেহের অবসান ঘটে।


ভারতের সংবিধান রচনায় গণপরিষদের কাজ সম্পর্কে আশ্চর্যজনক মজাদার তথ্য বা ফ্যাক্ট সম্পর্কে আপনার অনুভূতি আমাদের কমেন্টে জানান? 

আপনার ইনবক্সে প্রতিদিনের নতুন নতুন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য একেবারে বিনামূল্যে পেতে আমাদের বিনামূল্যের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন